ড, আহসান এইচ মনসুর

  বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩তম গভর্নরের দায়িত্ব পেয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক ড. আহসান এইচ মনসুর। ১৪ আগস্ট রাত ১০টা ৪০ মিনিটে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পাঁচ দিন পরপর ১০ আগস্ট পদত্যাগ করেন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। তিনি যোগ দিয়েছিলেন ২০২২ সালের ১২ জুলাই। দুই বছরের বেশি সময়ে ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার রোধ এবং ডলার-সংকটের সমাধানে ব্যর্থতাসহ নানা কারণে তাঁর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা সমালোচনার মুখে ছিল।

সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৭ বছর নির্দিষ্ট থাকায় বিদ্যমান বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী আহসান এইচ মনসুর গভর্নর পদে নিয়োগ পেতে পারেন না। কারণ, তাঁর বয়স এখন ৭২ বছর ৮ মাস। সে জন্য তাঁকে নিয়োগ দিতে সরকারকে ওই অর্ডার সংশোধন করতে হয়েছে। এতে গভর্নর পদের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মঙ্গলবার রাতে আহসান মনসুরকে নিয়োগ দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তার আগে এ বিভাগের তৈরি করা এ–সংক্রান্ত ফাইলে অনুমোদন দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

অনুমোদন পাওয়ার পর আগে অধ্যাদেশ জারি হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয় ।

আগেও একবার গভর্নরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করা হয় সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরের জন্য, যা ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। দেশের মুদ্রা সরবরাহ কত হবে, টাকার মান কতটা বাড়বে, মূল্যস্ফীতির হার কত রাখা হবে—এ সবই ঠিক করেন গভর্নর। দেশের মানুষের জীবনযাপনের মান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তাঁর সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে অনেকটা। কোনো দেশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের জন্য রাজনৈতিক পরিচয় বা সমর্থনকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই বিবেচনা করা হয়।

আগে কারা গভর্নর ছিলেন

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মোট ১২ জন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যাঁদের বেশির ভাগই আমলা। তবে প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ (১৯৭২-৭৪) ছিলেন একজন ব্যাংকার। দ্বিতীয় গভর্নর এ কে নাজিরউদ্দীন আহমেদের (১৯৭৪-৭৬) বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। তৃতীয় গভর্নর এম নূরুল ইসলাম (১৯৭৬-৮৭) ছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) কর্মকর্তা এবং তিনিই প্রথম আমলা গভর্নর।

চতুর্থ গভর্নর ছিলেন কর ক্যাডারের কর্মকর্তা শেগুফ্তা বখ্ত চৌধুরী (১৯৮৭-৯২)। পঞ্চম গভর্নর এম খোরশেদ আলমও (১৯৯২-৯৬) ছিলেন একজন সিএসপি কর্মকর্তা। ষষ্ঠ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান ব্যাংকার লুৎফর রহমান সরকার (১৯৯৬-৯৮)। সপ্তম গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (১৯৯৮-২০০১) অর্থনীতির শিক্ষক ও আমলা। অষ্টম গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ (২০০১-০৫) অর্থনীতির শিক্ষক, আমলা ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। নবম গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও (২০০৫-০৯) ছিলেন তা–ই। তিনি তিন সরকারের (বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক ও আওয়ামী লীগ) আমলের গভর্নর। দশম গভর্নর আতিউর রহমান (২০০৯-১৬) একজন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক। একাদশ গভর্নর ফজলে কবির (২০১৬-২২) এবং দ্বাদশ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও আমলা ছিলেন।

আহসান এইচ মনসুর সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক

ড. আহসান এইচ মনসুর একজন অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন। এর আগে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ওয়ালটনের একজন স্বাধীন পরিচালক হিসাবেও কাজ করেছেন।

ড. মনসুর ১৯৫১ সালে টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হন। তিনি ১৯৮২ সালে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

ড. মনসুর ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একই বছর অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা চলে যান। তিনি ১৯৭৭ সালে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি একজন স্নাতক ছাত্র এবং গবেষণা সহকারী হিসেবে কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অন্টারিও (১৯৭৮-৮১) এ স্নাতক স্তরে নিয়মিত অর্থনীতির কোর্সও করছিলেন। ডঃ মনসুর ১৯৮১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ প্রোগ্রামের অধীনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে যোগদান করেন এবং তারপরে ১৯৮২ সালে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে (জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম অ্যানালাইস এ) পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন

ড. মনসুর ১৯৮১ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগে কাজ করেছেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নীতি উন্নয়ন ও পর্যালোচনা বিভাগ এবং মধ্যপ্রাচ্য বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. মনসুর ১৯৮৯ সালে অর্থমন্ত্রী ওয়াহিদুল হকের অর্থ উপদেষ্টা নিযুক্ত হন এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, সুদান এবং ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সিনিয়র আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ড. মনসুর বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি  ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসাবে স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি পলিসি ইনসাইটসের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা বোর্ডেরও সদস্য।

আহসান এইচ মনসুর ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকারের জিডিপি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের সাথে মেলেনি এবং অর্থনীতির মন্দার পূর্বাভাস দিয়েছিল। তিনি বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অর্থনীতির জন্য ধৈর্য ধারণের প্রয়োজনীয়তার বর্ণনা দিয়েছেন। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে, তিনি বলেছিলেন যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তিনি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ব্যবহারের সুপারিশ করেন। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের তাদের বিদ্যমান ব্যাংক থেকে ঋণ ব্যবহার করে ব্যাংক কেনার বিষয়ে সমালোচনা করেন। তিনি ঋণ খেলাপি কমাতে আর্থিক খাতে সংস্কারের আহ্বান জানান। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ধাক্কা সরকারের নিষ্ক্রিয়তার ফলাফল এবং সম্পূর্ণরূপে বাহ্যিক কারণের উপর ভিত্তি করে নয়।

ইকোনোমেট্রিকা, জার্নাল অফ ইকোনমিক থিওরি এবং আইএমএফ স্টাফ পেপারস সহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ জার্নালে অর্থনৈতিক বিষয়ের উপর তার অনেক নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে।

তিনি ১৩ আগস্ট ২০২৪ ইং সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হোন।