দেশের পঞ্চবিংশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন হাই কোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ; যাকে নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

শনিবার রাতে রাষ্ট্রপতির আদেশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাকে এ নিয়োগ দেন।  এই নিয়োগ শপথ গ্রহণের তারিখ হইতে কার্যকর হইবে। হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শিক্ষার্থী, আইনজীবীসহ আন্দোলনকারীরা সেখানে বিক্ষোভ করেন। দুপুর দেড়টার দিকে নীতিগতভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান ওবায়দুল হাসান। আড়াইটার দিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্র তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

প্রাথমিক জীবন

আহমেদ ২৮ ডিসেম্বর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাংলাদেশের তৃতীয় অ্যাটর্নি জেনারেল এবং দুটি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রয়াত ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। তার মা প্রয়াত ড. সুফিয়া আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক ছিলেন। ভাষা সৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ড. সুফিয়া আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। ইশতিয়াক-সুফিয়া দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান সৈয়দ রেফাত আহমেদ। দ্বিতীয় সন্তান ডাক্তার রায়না আহমেদ ইংল্যান্ডে বসবাস করেন।

সৈয়দ রেফাত আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এএলবি(অনার্স) উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৮৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াধাম কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্‌ট ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল অব ল এন্ড ডিপ্লোমেসি থেকে এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন

লন্ডনের আর্থিক ও ব্যাংকিং হাব সিটিতে ব্যাংকিং সেক্টরে আইনজীবী হিসাবে আমার কর্মজীবন শুরু করেন।

সৈয়দ রেফাত ১৯৮৪ সালে ঢাকা জেলা আদালতে আইনজীবী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে হাই কোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হন। ২০০২ সালে সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন।

 তিনি হংকং এবং ওয়াশিংটন ডিসি-তে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারে কাজ করেছেন।

সৈয়দ রেফাত ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল হাই কোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন। দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাই কোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

২০০৩ সালে এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ট্রাফিক পুলিশ অফিসারদেরকে তার গাড়িকে স্যালুট না করার জন্য আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক শাহুদুল হক প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, ট্রাফিক পুলিশের কাউকে স্যালুট করার বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই এবং তারা নিরাপদ থাকলে তা করতে পারে। বিচারপতি এম এ মতিন এবং বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের বাংলাদেশ হাইকোর্ট বেঞ্চ শাহুদুল হকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ জারি করে যা আইন অনুযায়ী তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাপরিদর্শক পদ থেকে অপসারণ করে। বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভ করে যার ফলে মি. হকের চাকরি রক্ষা পায়।

আহমেদকে ২৭ এপ্রিল ২০০৫-এ হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারক করা হয়।

২০০৯ সালে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন বাঙালি বসতি স্থাপনকারী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী কর্তৃক দায়েরকৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা একটি আবেদনের শুনানি করেন।

২০১৭ সালের অক্টোবরে বিচারপতি মোঃ সেলিম ও আহমেদ সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে সাভার ট্যানারি এস্টেটে কেন্দ্রীয় এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের নির্মাণ কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। বিচারপতি মো: সেলিম ও আহমেদ সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান তালুকদারকে পটুয়াখালী জেলার ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকা থেকে দুই মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

অ্যাকর্ড চুক্তি স্থগিত করায় স্মার্ট জিন্স আপিল দায়ের করলে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে বিচারপতি মোঃ সেলিম এবং আহমেদ বাংলাদেশে অগ্নি এবং ভবন নিরাপত্তায় অ্যাকর্ড এর মেয়াদ স্থগিত করেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আহমেদ সাধারণ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের প্রশ্নে একটি বিভক্ত বেঞ্চের সদস্য ছিলেন। তিনি নির্বাচন কমিশনকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মনোনয়ন গ্রহণ করার জন্য বলেছিলেন তবে বেঞ্চে তার সহযোগী বিচারপতি বিচারপতি ইকবাল কবির দ্বিমত পোষণ করেন এবং খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেন।

২৮ জুলাই ২০১৯ তার নেতৃত্বে হাইকোর্ট বেঞ্চ ১৪ ​​টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধের বিপণন নিষিদ্ধ করে।

 রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৭ ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখে উত্তরা মডেল টাউনের (সেক্টর ১৫) তৃতীয় পর্বে মোঃ মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীকে একটি প্লট বরাদ্দ করে। রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ বরাদ্দ বাতিল করে যা বিচারপতি মোঃ ইকবাল কবির এবং বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ তা স্থগিত করে, এবং আগস্ট ২০১৯-এ চৌধুরীর প্রদত্ত অর্থ গ্রহণ করার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়।

২০১৯ সালের নভেম্বরে বিচারপতি মোঃ সেলিম এবং আহমেদ জাহাজ তেজস্ক্রিয় পদার্থ দ্বারা দূষিত হওয়ার কারণে জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য এমটি প্রোডিউসার এর আমদানি, সমুদ্র সৈকতে রাখা এবং স্ক্র্যাপিংয়ের অনুমতি অবৈধ ঘোষণা করেছে।