সম্প্রতি ত্রিপুরার ডাম্বুর জলবিদ্যুৎ
প্রকল্পের গেট খুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা
হচ্ছে। গত ২১ আগস্ট, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বাঁধের তিনটি গেটের
মধ্যে দুটি খুলে দেওয়া হয়।
গোমতী জেলাতে অবস্থিত গোমতী জলবিদ্যুৎ
কেন্দ্রের ডম্বুর স্লুইস গেট খুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক বন্যা
হয়েছে বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর বলা হয়েছে। ফেনীর মুহুরী নদীর পানির
উচ্চতা ৪১ বছরের ইতিহাস ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যরাতের অন্ধকারে ভারতের ত্রিপুরায় ডোম্বুর
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের গেট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। ভারত সর্বশেষ ১৯৯৩
সালে এই গেটটি খুলেছিল। যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ডুম্বুর বাঁধ কোথায়া অবস্থিত:
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায়
দুম্বুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ডুম্বুর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দক্ষিণ ত্রিপুরার ধলাই জেলার
গুমতি নদীর উপর ডুম্বুর হ্রদের কাছে অবস্থিত। একটি বাধ দিয়ে একটি জলাধার তৈরি করা হয়েছে।
এই জলাধারটিই ডুম্বুর হ্রদ নামে পরিচিত। হিন্দু ও বৌদ্ধদের আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত
ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ডুম্বুর-আকৃতির হওয়ায় এর নামকরণ ডুম্বুর করা হয়েছে। ত্রিপুরার
রাজধানী আগরতলা থেকে সড়কপথে এটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে বাংলাদেশের
খাগড়াছড়ি সিমান্ত থেকে এটি মাত্র ২ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।
গোমতী ত্রিপুরার প্রধান নদী। রাইমা আর
সরমা– এই দুটি ছোট নদী, ত্রিপুরার স্থানীয় ভাষায় যেগুলিকে বলা হয় ‘ছড়া’, ডুম্বুর এসে
মিশেছে। রাইমা লংথারাই রেঞ্জ থেকে প্রবাহিত হয়েছে এবং সরমা আথারমুরা রেঞ্জ থেকে উদ্ভূত
হয়েছে। এই দুটি ছোট নদী ডুম্বুর হ্রদে মিলিত হয়েছে। আর এই ডুম্বর হ্রদ থেকেই গোমতী
নদী উৎপন্ন হয়েছে। ডুম্বুর হ্রদে প্রায় ৪৮টি ছোট ছোট রয়েছে। শীতকালে এগুলিতে অনেক পরিযায়ী পাখিও আসে। এটা একটা
গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থলও। গোমতী বাঁধ তৈরির আগে রাইমা ও সরমার সঙ্গমস্থল থেকে সৃষ্ট
গোমতী নদী আথারমুরা রেঞ্জের একটি গিরিখাতের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। এটি তীর্থমুখের
(আক্ষরিক অর্থে 'তীর্থযাত্রীদের পয়েন্ট') পয়েন্টে এটি স্থানীয়ভাবে ডুম্বুর ফলস নামে
পরিচিত ছিল, এটিকে উপজাতীয়দের পাশাপাশি বাঙালি বসতিস্থাপনকারীরা পবিত্র বলে মনে করে
এবং তারা নদীতে স্নান করে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে পবিত্র সংক্রান্তি
পালন করে এবং এখানে মেলা বসে। ত্রিপুরার বেশিরভাগ নদী বা ছড়ার
মতোই এই গোমতীও স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের দিকে বয়ে গেছে। তীর্থমুখ থেকে
গোমতী পশ্চিমে মালবাসা গ্রাম পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে এবং তারপর এটি আবার দিক পরিবর্তন
করে, দেওতামুরা রেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দেওতামুড়া পার
হয়ে আরও ৬০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে এটি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে কুমিল্লা দিয়ে
বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গোমতি নদী আরো প্রায় ৮০কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে এটি কুমিল্লা
জেলার দাউদকান্দি উপজেলার শাপটা নামক স্থানে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এটি হলো
গোমতী নদীর গতিপথ। তবে বাস্তবে খাগড়াছড়ি সীমান্ত থেকে ডুম্বুর বাধটি মাত্র ২ কিমি দূরে
অবস্থিত। বাধের গেট ছেড়ে দিলে অতিরিক্ত পানি গোমতি নদী দিয়ে পুরোপুররি প্রবাহিত হতে
পারে না। কারন বাঁধ দেওয়ার কারণে গোমতীর নাব্যতা কমে গেছে। ফলে পানি প্লাবিত হয়ে সমতল
বা পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে অতি সহজেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
জানাগেছে, ১৯৬৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী
ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার অমরপুরে তীর্থমুখের প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার
উজানে মাদিরঘাটে গোমতী নদীতে বাঁধটি তৈরির কাজ
শুরু হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে এটি চালু হয়। ৩০মিটার উচ্চ মাধ্যাকর্ষণ বাঁধ তৈরি করা
হয়েছিল যাতে ১০ মেগাওয়াটের ইনস্টল ক্ষমতা থেকে ৮.৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা
হয়। বর্তমানে ২-৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন প্রকল্পটি
মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। বাঁধটি ৪৬বর্গকিলোমিটারের একটি উপত্যকা এলাকা ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুম্বর বাধটি
২৩°২৫´৪৫" উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°৪৯´২০" পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। জলাধারটির ধারনক্ষমতা
২৩,৫৭০ হেক্টর মিটার। বাধটির দৈর্ঘ্য ১০৩ মিটার, উচ্চতা ৩০ মিটার। সম্পূর্ণ জলাধারের
পানির স্তরের উচ্চতা ৯৩.৫৫ মিটার। অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাবার জন্য গেটে রয়েছে ৭টি,
প্রতিটি গেটের দৈর্ঘ্য ৪০ মিটার।
এই বাধের আগে পাহাড়ি রাজ্যে এটি ছিল সবচেয়ে উর্বর উপত্যকাগুলির মধ্যে একটি, এটির মতো ধানচাষের জন্য উপযুক্ত আবাদযোগ্য সমতল ভূমি অত্যন্ত সীমিত। সরকারী নথি থেকে জানা যায় যে ২৫৫৮টি পরিবারকে গুমতি প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল – এই পরিবারগুলোর জমির দলিল করার যোগ্য ছিল এবং জমির আনুষ্ঠানিক মালিক ছিল। তবে বেসরকারীভাবে অনুমান করা হয় ৮০০০ থেকে ১০,০০০ পরিবার বা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার আদিবাসী উপজাতি এই বাঁধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়। কমিউনিস্ট-সমর্থিত গণমুক্তি পরিষদসহ সমস্ত আদিবাসী সংগঠনগুলি ১৯৭৬ সালে গোমতী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করার তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু কংগ্রেস সরকার এই বিক্ষোভকে চূর্ণ করে দেয়।
0 মন্তব্যসমূহ