মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং গণতন্ত্রের পক্ষের কর্মী।
১. জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মাচাদো ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় মার্কুইস অব টোরো, সেবাস্তিয়ান হোসে আন্তোনিও রদ্রিগেজ দেল টোরো ই আসকানিও (১৭৩৯–১৭৮৭)-এর বংশধর। তার মা কোরিনা প্যারিসকা লরেন্তে (জন্ম ১৯৪০) একজন মনোবিজ্ঞানী, এবং তার বাবা এনরিক মাচাদো জুলোগা (১৯৩০–২০২৩) একজন বিশিষ্ট ইস্পাত ব্যবসায়ী এবং ভেনেজুয়েলার শিল্পপতিদের সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতি। চার বোনের মধ্যে মাচোদা সবার বড় ।
মাচাদোর পরিবার ভেনেজুয়েলার পুরোনো এবং সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম। তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে যারা ভেনেজুয়েলার একটি বিখ্যাত ইস্পাত কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
২. শিক্ষা ও পেশাগত জীবন
* শিক্ষা:
মাচাদো কারাকাসের আন্দ্রিস বেলো ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি (Universidad Católica Andrés
Bello) থেকে শিল্প প্রকৌশলে (Industrial Engineering) স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
* তিনি ভেনেজুয়েলার আইইএসএ (IESA) থেকে ফিন্যান্সে একটি বিশেষায়িত কোর্স করেন।
* তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় (Yale
University) থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশা:
রাজনীতিতে আসার আগে মাচাদো মূলত তার পারিবারিক ব্যবসায় এবং একটি অলাভজনক সংস্থায় পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন।
ভ্যালেন্সিয়ায় গাড়ি শিল্পে কাজ করার পর, তিনি ১৯৯৩ সালে কারাকাসে ফিরে আসেন। পরে, রাজনৈতিক সংস্থা Súmate-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ফাউন্ডেশনটি যেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত না হয়, সে কারণে তিনি Atenea
Foundation থেকে পদত্যাগ করেন।
৩. পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
* বিবাহ: তিনি প্রাক্তন ভেনেজুয়েলান রাজনীতিবিদ এবং শিল্পপতি রিকার্ডো ওসুনো (Ricardo Ossunó)-কে বিবাহ করেছিলেন। তবে পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
* স্বামী-সন্তান:
তাদের দাম্পত্য জীবনে তিনটি সন্তান রয়েছে। এক মেয়ে ও দুই ছেলে — তাদের নাম: আনা করিনা, রিকার্ডো এবং হেনরিক । (Ana Corina,
Ricardo, Henrique) তার সন্তানরা দেশে মৃত্যুর হুমকির কারণে বিদেশে থাকে। মাচাদো একজন ক্যাথলিক।
তার ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত রাজনীতির চেয়ে আড়ালে থাকে, তবে ভেনেজুয়েলার সংকটের কারণে তার পরিবারও ঝুঁকিতে ছিল।
৪. রাজনৈতিক জীবন ও কর্ম
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে একত্রিত করার মধ্য দিয়ে।
প্রাথমিক activism (Súmate)
* Súmate (সুমতে) প্রতিষ্ঠা: ২০০২ সালে তিনি 'সুমতে' নামক একটি নাগরিক সমাজ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ভেনেজুয়েলায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং ভোট তদারকি করা।
* চাভেজের বিরোধিতায় উত্থান: ২০০৪ সালে হুগো চাভেজের অপসারণের জন্য আয়োজিত একটি গণভোটে 'সুমতে' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময় থেকেই তিনি সরকারের কড়া সমালোচক এবং বিশিষ্ট বিরোধী নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান।
আইনসভা সদস্য (National
Assembly)
* জাতীয় পরিষদ সদস্য: ২০১০ সালে তিনি মিরাণ্ডা রাজ্য (Miranda State) থেকে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের (National Assembly) সদস্য নির্বাচিত হন।
* বিরোধিতা: পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে তিনি হুগো চাভেজের সমাজতান্ত্রিক নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং সরকারের দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
Vente Venezuela (ভেন্তে ভেনেজুয়েলা) এবং বর্তমান নেতৃত্ব
* পার্টি প্রতিষ্ঠা: ২০১৩ সালে তিনি ভেন্তে ভেনেজুয়েলা (Vente Venezuela) নামক একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।
* অযোগ্যতা ও দমন: সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করার অভিযোগে ২০১৪ সালে তাকে জাতীয় পরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তাকে দেশদ্রোহ এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এবং রাজনৈতিক পদ ধারণে ১৫ বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
* ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ২০২৩ সালে, নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে তিনি বিরোধী দলের প্রাথমিক নির্বাচনে ব্যাপক ব্যবধানে জয়ী হন এবং রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হন। তবে সরকার তার উপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে, যার ফলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি।
মাচাদোর ইজরায়েল সম্পর্কিত অবস্থান ও বক্তব্য
1. ইসরায়েলকে স্ট্র্যাটেজিক মিত্র হিসেবে দেখা**
মাচাদো ইসরায়েলকে “পশ্চিমা মূল্যবোধের” রক্ষা এবং “স্বাধীনতা ও জঙ্গি ও তত্ত্বাবধায়ক শক্তিগুলোর হুমকি” মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।
2. গাজার হামলা ও হামাসের প্রতি সমালোচনা
অক্টোবর ২০২৩-এর হামাসের হামলার পরে তিনি হামাসের “সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে সমালোচনা করেছেন এবং বলছেন, “যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে হবে।”
3. লিকুদ পার্টির সঙ্গে সহযোগিতা
তার দল, Vente Venezuela, ২০২০ সালে ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে — রাজনৈতিক, জিওপলিটিকস, সুরক্ষা ইত্যাদির বিষয়ে অভিন্ন কাজের লক্ষ্যে।
4. ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন
মাচাদো প্রশাসনে আসলে ইসরায়েলের সাথে ভেনেজুয়েলার ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
5. দুর্নীতিপূর্ণদের বিরুদ্ধায় ইসরায়েলকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন
তাঁর যুক্তি যে বর্তমান ভেনেজুয়েলার সরকার (মাদুরোর শাসন) ইরান ও অভ্যন্তরীণ চরমপন্থী গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত রয়েছে — এবং এই সংযোগ ইসরায়েলের জন্য “অস্তিত্বিক হুমকি” হিসাবে বর্ণিত হয়।
6. পশ্চিমা মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান: তিনি প্রায়শই ইসরায়েলকে 'স্বাধীনতার প্রকৃত মিত্র' এবং 'পশ্চিমা মূল্যবোধের রক্ষক' হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংক্ষেপে, মারিয়া কোরিনা মাচাদোর অবস্থান বর্তমান ভেনিজুয়েলা সরকারের ইসরায়েল নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, সম্পর্ক জোরদার এবং জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের পক্ষে একজন শক্তিশালী প্রবক্তা।
৫. নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫
* স্বীকৃতি: ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাকে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র এবং শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের জন্য তার অদম্য ও ক্লান্তিহীন কাজের জন্য দেওয়া হয়। নোবেল কমিটি তাকে লাতিন আমেরিকার বেসামরিক সাহসের অন্যতম অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে।
* বর্তমান অবস্থান: রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং সরকারের পক্ষ থেকে জীবননাশের হুমকির কারণে তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে বা গোপন স্থানে আছেন।
মাচোদার নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক কেন
মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বামপন্থী ভাষ্যকার এবং কিছু আন্তর্জাতিক অধিকার গোষ্ঠীর কাছ থেকে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি করেছে।
এই বিতর্কের প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ:
১. ইসরায়েল এবং সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি সমর্থন
- ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন: মাচাদো ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির একজন স্পষ্ট সমর্থক এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে সমালোচিত।
- দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের অঙ্গীকার: তিনি নির্বাচিত হলে ভেনিজুয়েলার ইসরায়েলি দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পরিপন্থী বলে অনেকে মনে করেন।
- সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান: অতীতে তিনি ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন, যা 'শান্তি' পুরস্কারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচকরা মনে করেন।
২. ডানপন্থী রাজনীতি এবং ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক
- মার্কিন ডানপন্থী স্বার্থের কাছাকাছি: সমালোচকরা অভিযোগ করেন যে তিনি ইউরোপের কট্টর রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী স্বার্থের খুব কাছাকাছি।
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা: নোবেল পুরস্কার জেতার পর মাচাদো প্রকাশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং তাঁর "নির্ধারক সমর্থনের" প্রতি পুরস্কার উৎসর্গ করেছেন। ট্রাম্প নিজেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের একজন দাবিদার ছিলেন, ফলে মাচাদোর এই ঘনিষ্ঠতা নোবেল পুরস্কারকে 'রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট' হিসেবে দেখায়।
৩. ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক অবস্থান
- অর্থনৈতিক অবরোধের সমর্থন: অনেকে যুক্তি দেন যে মাচাদো ভেনিজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (sanctions) এবং চাপ প্রয়োগের নীতিকে সমর্থন করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞাগুলি দেশের সাধারণ জনগণের জন্য তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- অভ্যুত্থানের অভিযোগ: ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাসীন দল এবং বামপন্থী ভাষ্যকাররা তাঁকে 'রাজনৈতিক অস্থিরতা উসকে দেওয়া' এবং 'বিদেশী শক্তির সঙ্গে আঁতাত' করার জন্য অভিযুক্ত করেন। কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং অ-গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন।
সমালোচকদের মূল বক্তব্য হলো, নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরস্কার এমন ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত নয়, যিনি এক দেশে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বললেও অন্য দেশে (যেমন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত) আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেন বা নিজ দেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। তাদের মতে, এই পুরস্কারের মাধ্যমে নোবেল কমিটি 'শান্তি'-র পরিবর্তে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
সংক্ষেপে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলার একজন 'লৌহ মানবী' হিসাবে পরিচিত, যিনি দেশটির স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

0 মন্তব্যসমূহ