ভারতের নতুন সংসদ ভবন

য়াদিল্লিতে অবস্থিত পার্লামেন্ট হাউস (বা সংসদ ভবন) হল ভারতের আইনসভা। এখানে লোকসভা এবং রাজ্যসভা রয়েছে যা ভারতের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদে যথাক্রমে নিম্ন ও উচ্চকক্ষ।

ভারতের সেন্ট্রাল ভিস্তা পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে, নতুন দিল্লিতে নতুন সংসদ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ২৮ মে ২০২৩ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বোধন করেন।

রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ৭৫০ মিটার দূরত্বে, এটি সংসদ মার্গে অবস্থিত যা সেন্ট্রাল ভিস্তা অতিক্রম করে এবং বিজয় চক, ইন্ডিয়া গেট, ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল, ভাইস প্রেসিডেন্ট হাউস, হায়দ্রাবাদ হাউস, সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বাসস্থান, মন্ত্রী ভবন এবং ভারত সরকারের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিট দ্বারা বেষ্টিত।

ভারতের সংসদ ভবন তৈরি হয়েছিল ১৯২৭ সালে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাও ক্রমে বেড়েছে। আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। ৯৬ বছরের পুরোনো ওই ভবনে বর্ধিত সংসদ সদস্যদের স্থান সংকুলান কঠিন। পুরানো কাঠামোর সাথে স্থিতিশীলতার উদ্বেগের কারণে বিদ্যমান কমপ্লেক্সটি প্রতিস্থাপনের জন্য একটি নতুন সংসদ ভবনের প্রস্তাব ২০১০-এর দশকের গোড়ার দিকে উত্থিত হয়। বর্তমান ভবনের বেশ কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার জন্য তৎকালীন স্পিকার মীরা কুমার ২০১২ সালে একটি কমিটি গঠন করেন।

রাজ্যসভায় এখন বসতে পারবেন ৩৮৪ জন। লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের যুগ্ম অধিবেশন হতো পুরোনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে, যেখানে ভারতীয় সংবিধান রচিত হয়েছিল ও ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যেখানে মধ্যরাত্রে ভাষণ দিয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। নতুন কমপ্লেক্সে লোকসভা চেম্বারে ৮৮৮টি আসন এবং রাজ্যসভার চেম্বারে ৩৮৪টি আসন রয়েছে। পুরানো সংসদ ভবনের মতো এতে কেন্দ্রীয় হল নেই। নতুন ভবনে দুই কক্ষের সদস্যদের যুগ্ম অধিবেশন বসবে লোকসভায়। সেখানে ১ হাজার ২৮০ জন সদস্য একত্রে বসতে পারবেন। ৪ তলা বিশিষ্ট ভবনের বাকি অংশে মন্ত্রীদের অফিস ও কমিটি কক্ষ রয়েছে।

ভারতের নতুন সংসদ ভবন (ত্রিকোনাকার), পাশেই পুরাতন সংসদ ভবন (বৃত্তকার)

ভবনটির আয়তন ২০,৮৬৬ বর্গ মিটার (এর ভিতরে  একটি বটগাছের জন্য ২,০০০ বর্গ মিটার এলাকার খোলা আকাশ রাখা হয়েছে)। অর্ধ একর আয়তনের ৩টি সেক্টরে বিভক্ত মোট ৬,০৬০ বর্গ মিটার বা ১.৫ একর খোলা জায়গা সহ ২২,৯০০ বর্গ মিটার (ব্যাস ১৭০.৭ মিটার) আয়তনের বিদ্যমান পুরানো বৃত্তাকার ভবনের তুলনায় এটি ১০% ছোট ।

নতুন সংসদ ভবনের নামও হবে নতুন। তবে এখনো তা ঠিক হয়নি। তবে নতুন ভবনের তিনটি প্রবেশদ্বারের নামকরণ হয়েছে জ্ঞানদ্বার, শক্তিদ্বারকর্মদ্বার। মূল প্রবেশদ্বারে লেখা সত্যমেব জয়তে

চারতলার এই ভবন সাজানো হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শ্রেষ্ঠ সামগ্রী দিয়ে। কার্পেট আনা হয়েছে উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর থেকে। মেঝে তৈরির বাঁশ এসেছে ত্রিপুরা থেকে। বিভিন্ন ধরনের লাল ও সাদা বেলেপাথর ও গ্রানাইট এসেছে রাজস্থান থেকে।

মহারাষ্ট্রের নাগপুর থেকে আনা হয়েছে সেগুনকাঠ। পাথরের ওপর জালির কাজ করানো হয়েছে রাজস্থানের রাজনগর ও দিল্লির লাগোয়া উত্তর প্রদেশের নয়ডা থেকে।

পিতল আনা হয়েছে গুজরাটের আহমেদাবাদ থেকে। জাতীয় পাখি ময়ূর ও জাতীয় ফুল পদ্মের থিমফুটিয়ে তোলা হয়েছে লোকসভা ও রাজ্যসভার অভ্যন্তরীণ নকশায়।

নতুন সংসদ ভবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

·         নতুন সংসদ ভবন নির্মাণের প্রকল্প টাটা প্রজেক্টস লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছে।

·         নকশাটি তৈরি করেছে HCP ডিজাইন, প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড।

·         কাঠামোটি ৬৪,৫০০ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে নির্মিত।

·         মোট খরচ আনুমানিক ৯৭১ কোটি টাকা।

·         সেন্ট্রাল ভিস্তা ভবনের আদলে নির্মিত নতুন সংসদটি একটি ত্রিভুজাকার কাঠামো। এটিতে লোকসভা, রাজ্যসভা, কেন্দ্রীয় লাউঞ্জ এবং সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের অফিস রয়েছে।

·         ভবনটিতে ছয়টি প্রবেশপথ আছে: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রবেশদ্বার; একটি লোকসভার স্পিকার, রাজ্যসভার চেয়ারপার্সন এবং সংসদ সদস্যদের জন্য; সাধারণভাবে একটি আনুষ্ঠানিক প্রবেশদ্বার; এমপিদের জন্য আরেকটি প্রবেশদ্বার; এবং দুটি পাবলিক প্রবেশদ্বার আছে।

·         নতুন পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সে চারতলা বিশিষ্টনিচের গ্রাউন্ড, উপরের গ্রাউন্ড, প্রথম তলা ও দ্বিতীয় তলা।

·         নতুন সংসদে কমিটি রুম, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রকের প্রধান কার্যালয়, লোকসভা সচিবালয়, রাজ্যসভা সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, কিছু সংসদ সদস্য এবং কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য অফিস সহ মোট ১২০টি অফিস স্পেস রয়েছে। এতে এমপিদের পড়ার ঘরও রয়েছে। তবে এতে সেন্ট্রাল হল থাকবে না।

নতুন সংসদ ভবনের লোকসভা কক্ষ

·         লোকসভা চেম্বার ৩,০১৫ বর্গ মিটার এলাকা নিয়ে গঠিত। এতে ১,১৪৫ বর্গ মিটার আয়তনের বর্তমান ৫৪৩ আসনের পরিবর্তে ৮৮৮ টি আসন থাকবে।

·         রাজ্যসভার চেম্বার ৩,২২০ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ১,২৩২ বর্গ মিটার আয়তনের ২৪৫ আসনের বর্তমান রাজ্যসভার বিপরীতে এতে ৩৮৪টি আসন থাকবে।

·         একটি যৌথ অধিবেশন চালানোর জন্য নতুন লোকসভা চেম্বার এ ১,২২৪ জন সদস্যকে জায়গা সক্ষম।

·         সাংসদরা স্পিকারের সামনে একটি ঘোড়ার নালার প্যাটার্নে দুই আসনবিশিষ্ট বেঞ্চে বসবেন, এতে যৌথ অধিবেশনের সময তিনজন বসাতে পারবে।

·         আসনগুলি ৬০ সেমি চওড়া এবং ৪০ সেমি উচ্চতা বিশিষ্ট হবে, যা বর্তমান আসন এর চেয়ে বড়।  বর্তমান আসনগুলির প্রস্থ ৪৫ সেমি এবং উচ্চতা ৪০সেমি।

·         নতুন ভবনটিতে ছয়টি কমিটি কক্ষ থাকবে। বর্তমান কাঠামোতে এরকম তিনটি কক্ষ রয়েছে।

·         মন্ত্রী পরিষদের ব্যবহারের জন্য ৯২টি কক্ষ থাকবে।

·         পুনর্নির্মাণকৃত শ্রম শক্তি ভবনে সাংসদের জন্য প্রায় ৮০০ টি চেম্বার তৈরি করা হচ্ছে। এগুলির নির্মাণ এপ্রিল ২০২২ সালে শুরু হয়, ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখানে সকল এমপিদের জন্য কক্ষ থাকবে এবং একটি আন্ডারপাসের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হবে।

·         ভবনটি ভূমিকম্প-প্রতিরোধী হবে  এবং সবচেয়ে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির অনুকূল।

·         আসবাবপত্রে স্মার্ট ডিসপ্লের জন্য ব্যবস্থা করা হবে, ভোটদানের সহজতার জন্য বায়োমেট্রিক্স, ডিজিটাল ভাষা ব্যাখ্যা বা অনুবাদ সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম মেটাডেটা এবং প্রোগ্রামেবল মাইক্রোফোন তৈরি করার জন্য রেকর্ডিং পরিকাঠামোর ব্যবস্থা থাকবে।

·         হলের অভ্যন্তরীণ অংশে ভার্চুয়াল সাউন্ড সিমুলেশন লাগানো হবে যাতে প্রতিধ্বনিত শব্দের সঠিক মাত্রা সেট করা যায় এবং প্রতিধ্বনি সীমিত করা যায়।

·         এটি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দেশীয় স্থাপত্যকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রদর্শন করবে।

·         নতুন লোকসভা চেম্বারটি ভারতের জাতীয় পাখি, ময়ূরের আদলে ডিজাইন করা হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন রাজ্যসভা চেম্বার জাতীয় ফুল, পদ্মের সাথে সাদৃশ্য বহন করে।

·         সামগ্রিকভাবে, নবনির্মিত ভবনটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলির বিভিন্ন স্থাপত্যের প্রভাব প্রতিফলিত করে, যেমন রাষ্ট্রপতি ভবন, সরকারের অফিসিয়াল নথিতে বলা হয়েছে।

·         পুরনো ভবন ব্যবহার চলবে। মৌলিক স্থাপত্য কৌশল হল দুটি বিল্ডিং একে অপরের পরিপূরক করা। সরকারের উল্লিখিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরানো ভবনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সম্পূর্ণ যত্ন নেওয়া হবে। বিদ্যমান সংসদ ভবনটি দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।

·         নতুন ভবন নির্মাণের পর মূল সংসদ ভবনের দৃশ্যমানতায় যাতে কোনো পরিবর্তন না হয় সে চেষ্টা চলছে। সংসদ কমপ্লেক্সে অবস্থিত সমস্ত মূর্তিও পুনরুদ্ধার করা হবে।

·         সরকারের অফিসিয়াল নথিতে বলা হয়েছে নতুন ভবনে লোকসভা এবং রাজ্যসভা চেম্বারের প্রতিটি বেঞ্চে দুইজন সদস্য পাশাপাশি বসতে সক্ষম হবেন। প্রতিটি আসনে ডিজিটাল সিস্টেম এবং টাচ স্ক্রিন থাকবে।

·         একটি কেন্দ্রীয় আঙিনা উভয় হাউসের সদস্যদের জন্য একটি খোলা বৈঠকের জায়গা তৈরি করবে।

·         সুবিধাটি উচ্চ-স্তরের নিরাপত্তা মান পূরণ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে৷

·         ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নতুন ভবনে একটি সংবিধান হল থাকবে। অন্যান্য আসন্ন কাঠামোর মধ্যে রয়েছে একটি লাইব্রেরি, একটি ডাইনিং রুম এবং সদস্যদের জন্য যথেষ্ট পার্কিং।

·         নতুন ভবনটিতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং পানি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে৷ নথিতে বলা হয়েছে, পুরো বিল্ডিং জুড়ে ১০০% ইউপিএস পাওয়ার ব্যাকআপের ব্যবস্থা করা হবে।

·         নতুন ভবনের ডিজাইনিং আহমেদাবাদ-ভিত্তিক এইচসিপি ডিজাইন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড দ্বারা করা হয়েছিল। টাটা প্রজেক্টস নতুন সংসদ ভবন নির্মাণের চুক্তি জিতেছে, যা কেন্দ্রের সেন্ট্রাল ভিস্তা পুনঃউন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ।

·         বর্তমান সংসদে রয়েছে সংসদ ভবন (পার্লামেন্ট হাউস), অভ্যর্থনা কার্যালয় ভবন, সংসদ সৌধ (সংসদ ভবন অ্যানেক্সি), সংসদ ভবন অ্যানেক্সি পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং সংসদীয় জ্ঞানপীঠ (সংসদ গ্রন্থাগার ভবন)।

·         প্রায় ২,০০০ জন প্রত্যক্ষভাবে এর নির্মাণে জড়িত এবং আরও ৯,০০০ জন পরোক্ষভাবে সেখানে জড়িত।

·         দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দুই শতাধিক শিল্পীও এই ভবনে কাজ করেছে।

 

এক নজরে নতুন সংসদ ভবন :

দ্য পার্লামেন্ট হাউস (The Parliament House) সংসদ ভবন

সাধারণ তথ্য

ধরন

সংসদ ভবন

অবস্থান

১১৮, সংসদ মার্গ, নতুন দিল্লি, দিল্লি

শহর

নতুন দিল্লি

দেশ

ভারত

স্থানাঙ্ক

২৮.৩৭০২° উত্তর ৭৭.১২৩৬° পূর্ব

ভূমিবিদারক

১ অক্টোবর ২০২০

নির্মাণ শুরু 

১০ ডিসেম্বর ২০২০

সম্পূর্ণ

২০ মে ২০২৩

উদ্বোধন

২৮ মে ২০২৩

ব্যয়

৮৬২ কোটি রুপি (১০৫.৩৬ মিলিয়ন ডলার)

গ্রাহক

কেন্দ্রীয় গণপূর্ত বিভাগ

স্বত্বাধিকারী

ভারত সরকার

জমির মালিক

ভারত সরকার

উচ্চতা

৩৯.৬ মিটার

কারিগরী বিবরণ

তলার সংখ্যা

তলার আয়তন

১,৭৩,৫৭০ বর্গ ফুট (১৬,১২৫ বর্গ মিটার)

ভূতল

২,২৪,৬০০ বর্গ ফুট  (২০,৮৭০ বর্গ মিটার)

নকশা এবং নির্মাণ

স্থপতি

বিমল প্যাটেল

স্থাপত্য সংস্থা

এইচসিপি ডিজাইনের প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড

প্রধান ঠিকাদার

টাটা প্রজেক্টস লিমিটেড

অন্যান্য তথ্য

আসন ধারণক্ষমতা

১,২৭২

লোকসভা কক্ষ: ৮৮৮

রাজ্যসভা কক্ষ: ৩৮৪

কর্ম দিন

২৩,০৪,০৯৫

স্টিল ব্যবহৃত হয়েছে

২৬,০৪৫ মেট্রিক টন

সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে

৬৩,৮০৭ মেট্রিক টন

ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করা হয়েছে

৯,৬৮৯ ঘন মিটার